প্রতিষ্ঠাতার গল্প

মিরা: নিছক কোনো প্রযুক্তি নয়, একটি মেয়ের কণ্ঠ ফোটানোর গল্প

একজন সাধারণ বাবা থেকে 'মিরা ম্যাম'-এর স্রষ্টা হয়ে ওঠার পেছনের কথা।

মিরা গল্পটি বলে শোনাবে — নিচেও স্টপ বাটন আছে

শহরের চার দেয়ালের নীরবতা

শহরের একটি সাধারণ ফ্ল্যাট। জানালার ওপাশে হয়তো গাড়ির হর্ন শোনা যায়, কিন্তু ঘরের ভেতর বড্ড নিস্তব্ধতা। গ্রামের সেই কোলাহল নেই, দাদি-নানির গল্পের আসর নেই, উঠোনে ছুটে বেড়ানোর খেলার সাথী নেই। আছে শুধু চার দেয়াল, একটা স্মার্টফোন আর নিস্তব্ধতা।

মারিয়ামের গল্প (বয়স ৫)

মারিয়ামের বয়স তখন পাঁচ। আমি খেয়াল করলাম, আমার মেয়েটা দিন দিন বড্ড চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে চট করে উত্তর দেয় না। সে যে বোঝে না তা নয়, কিন্তু গুছিয়ে কথা বলার অভ্যাস বা সাহস কোনোটাই তার গড়ে উঠছে না। কারণ, কথা বলার জন্য যে একজন ধৈর্যশীল সঙ্গী দরকার, শহরের এই যান্ত্রিক জীবনে তার বড্ড অভাব। স্ক্রিনের কার্টুনগুলো শুধু কথা শোনায়, কিন্তু মারিয়ামের কথা শোনার জন্য তো তারা অপেক্ষা করে না!

এক বাবার ভাবনা থেকে শুরু

একজন বাবা হিসেবে বিষয়টা আমাকে ভীষণ ভাবিয়ে তুলল। মনে হলো, এমন কেউ কি থাকতে পারে না, যে আমার মেয়ের আধো আধো কথাগুলো মন দিয়ে শুনবে? ভুল হলে রাগ করবে না, বরং পরম মমতায় বারবার শুধরে দেবে? সাধারণ পুতুল তো কথা বলতে পারে না, আর গেমগুলো শিশুকে শুধু বোবা বানিয়ে রাখে। মারিয়ামের দরকার এমন একজন, যে ওর সাথে কথা বলবে।

যে চিন্তা, সেই কাজ

পেশায় আমি একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। দীর্ঘ নয় বছরের বেশি সময় ধরে দেশি-বিদেশি নানা জটিল সিস্টেম ও আর্কিটেকচার নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে জানতাম, চাইলে প্রযুক্তির মাধ্যমেই এর সমাধান করা সম্ভব। শুরু হলো রাতের পর রাত জেগে কোডিং, টেস্টিং, ভুল করা আর নতুন করে গড়ার পালা।

লক্ষ্য ছিল একটাই মারিয়ামের জন্য খাঁটি বাংলায় কথা বলতে পারা এমন একজন 'ম্যাম' তৈরি করা, যে শুধু যান্ত্রিকভাবে শেখাবে না, বরং একজন ভালো বন্ধুর মতো গল্প করবে। আর সেই সাথে থাকবে অভিভাবকদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, যেন সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মাকে এক মুহূর্তের জন্যও ভাবতে না হয়।

মিরার জন্ম এবং একটি সৎ প্রচেষ্টা

অক্লান্ত পরিশ্রমের পর অবশেষে জন্ম নিল 'মিরা'। লাইভ ভয়েস (Voice AI) দিয়ে কথা বলা ও শেখানোর এই প্রযুক্তিটি দাঁড় করানো মোটেই সহজ ছিল না। এর পেছনে প্রয়োজন হয় শক্তিশালী সার্ভার আর এপিআই (API)-এর বিশাল খরচ। অনেকেই হয়তো ফ্রি অ্যাপের নামে শিশুদের তথ্য বা বিজ্ঞাপনের ফাঁদ পাতে, কিন্তু আমি চেয়েছি শতভাগ নিরাপদ ও বিজ্ঞাপনমুক্ত একটি সত্যিকারের শিক্ষাঙ্গন।

একটু ভেবে দেখুন, বর্তমানে যেকোনো মোবাইল সিমে সাধারণ কথা বলতে গেলেও মিনিটে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত কেটে নেয়। গড়ে ৩ টাকা মিনিট ধরলেও, শুধু ফোনে এক ঘণ্টা কথা বলতেই প্রায় ১৮০ টাকা খরচ হয়ে যায়। সেখানে অত্যাধুনিক লাইভ এআই (Live AI) প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী সার্ভার পরিচালনা করার মতো বিশাল খরচ সামলেও মিরা ম্যামের ফি রাখা হয়েছে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ২০০ টাকা!

অর্থাৎ, সাধারণ একটি মোবাইল কলের খরচেই আপনার সন্তান পাচ্ছে সম্পূর্ণ নিজস্ব একজন স্মার্ট, নিরাপদ এবং অসীম ধৈর্যশীল শিক্ষিকা।

এর পুরোটাই রাখা হয়েছে প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধ্যের কথা ভেবে। আমার লক্ষ্য ব্যবসা নয়, বরং সাধারণ ফোন কলের খরচেই বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত, নিরাপদ ও বিজ্ঞাপনমুক্ত প্রযুক্তিটি আমাদের দেশের শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া।

এই গল্পটা কার জন্য?

মারিয়ামের জন্য তৈরি করা মিরা আজ আর শুধু আমার ঘরেই সীমাবদ্ধ নেই। শহরের ফ্ল্যাটে বন্দি যে শিশুটি কথা বলার একজন সঙ্গী খুঁজছে, যে বাবা-মা সন্তানের ডিজিটাল নিরাপত্তা আর কথা বলার জড়তা নিয়ে চিন্তিত মিরা আজ তাদের সবার।

ইমরানের মেয়ের প্রয়োজন থেকে যার জন্ম, আজ তা দেশের প্রতিটি পরিবারের নিশ্চিন্ত ভরসা হয়ে উঠুক এটাই আমাদের একমাত্র প্রতিশ্রুতি।

ইমরান আহমেদ

প্রতিষ্ঠাতা ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার · সবকিছুর ঊর্ধ্বে, মারিয়ামের বাবা

মিরার সাথে পাঠ শুরু অভিভাবক গাইড আমাদের কথা